রাজধানী

রাড্ডা হামলায় ৩০ জন শনাক্ত, গ্রেপ্তার ১৬: নির্দেশদাতা ও মূল হোতারা এখনো অধরা

সিসিটিভি ও প্রযুক্তিগত তথ্য বিশ্লেষণে শনাক্ত আসামিরা; রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা, অভিযান চললেও নতুন গ্রেপ্তার নেই
রাজধানীর মিরপুর-১ নম্বরে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলা, লুটপাট, ভাঙচুর ও স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় পুলিশ এখন পর্যন্ত প্রায় ৩০ জনকে শনাক্ত করেছে।  তাঁদের মধ্যে ১৬ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।  তবে হামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আরও ১৪ জন এখনো গ্রেপ্তার হননি।  তাঁদের ধরতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালাচ্ছে।
সর্বশেষ বৃহস্পতিবার রাতে শাহ আলীর গুদারাঘাট এলাকা থেকে নুর আলম নামে একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।  শুক্রবার নতুন করে কোনো আসামিকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি বলে পুলিশ জানিয়েছে।
পুলিশের দাবি,ঘটনাস্থল ও আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ, মোবাইল ফোনের প্রযুক্তিগত তথ্য এবং স্থানীয় বিভিন্ন সূত্র থেকে পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে হামলায় অংশ নেওয়া এবং হামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের শনাক্ত করা হয়েছে।  গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হামলায় জড়িত থাকার কথা স্বীকার না করলেও প্রযুক্তিগত তথ্যের মাধ্যমে তাঁদের সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
সর্বশেষ গ্রেপ্তার হওয়া নুর আলমকে আবুল কালাম আজাদ ওরফে শুটার লেলিনের অন্যতম সহযোগী বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।  এ ঘটনায় এর আগে সোহেল, জুয়েল, জিহাদ হাসান, রাব্বি, সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতির অফিস সহকারী শাহাদাত হোসেন, কাজী মকবুল হোসেন, সমিতির সম্পাদক শাহ আলম, সদস্য আতিকুর রহমান ও কামরুল ইসলাম, শাকিল, মিন্টু, মিলন, শাহ আলী থানা বিএনপির সদস্য সাইফুল ইসলাম খোকন, শাহ আলী থানার ৮ নম্বর ওয়ার্ড শ্রমিক দলের সভাপতি আলম এবং লোবেড গাড়ির চালক শহীদুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
গত ২৪ সেপ্টেম্বর দিবাগত রাতে মিরপুর-১ নম্বরে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলা চালানো হয়।
অভিযোগ রয়েছে, দুই শতাধিক ব্যক্তি দেশীয় অস্ত্র ও ভাঙার সরঞ্জাম নিয়ে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে প্রবেশ করেন।  সেখানে দুই নিরাপত্তাকর্মীকে জিম্মি করে মূল্যবান চিকিৎসা সরঞ্জাম,ওষুধ, টিকা, নগদ টাকা ও বিভিন্ন মালামাল লুট করা হয়।  পরে ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে একটি পাকা ও তিনটি আধাপাকা ভবনসহ স্থাপনার বড় একটি অংশ গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়।   ঘটনার পর সেখানে ‘সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেড’-এর সাইনবোর্ড ও ব্যানার টাঙানো হয়।
তদন্তসংশ্লিষ্টরা বলছেন, হামলার আগে রাত ১২টা ৫ মিনিটের দিকে শাহ আলী থানা ছাত্রদলের সাবেক আহ্বায়ক আবুল কালাম আজাদ ওরফে শুটার লেলিনের কার্যালয়ের সামনে কয়েকজনকে জড়ো হতে দেখা যায়।  মামলার এজাহারভুক্ত আসামি বিএনপি নেতা মোহাম্মদ হানিফ মিয়ার কার্যালয়ের সামনেও লোকজন জড়ো হওয়ার তথ্য সিসিটিভি ফুটেজে পাওয়া গেছে বলে তদন্তসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। পরে হামলাকারীদের একটি অংশ স্বাস্থ্যকেন্দ্রসংলগ্ন ছিন্নমূল মার্কেটের কাছে যায়।
সেখানে লাঠিসোঁটা, রামদা ও হাতুড়িসহ দেশীয় অস্ত্র সংগ্রহের অভিযোগ রয়েছে। হামলায় যাওয়ার আগে কয়েকজন মাথায় কাপড় বাঁধেন ও মুখ ঢেকে নেন বলেও তদন্তসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। ঘটনাস্থলের পাশের আন-নূরী জামে মসজিদসংলগ্ন ৬/৬ নম্বর সড়কের একটি ফুটেজে হামলার সময় স্থানীয় শাহ আলী থানা শ্রমিক দলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক ইব্রাহিমসহ কয়েকজনকে লাঠি হাতে দেখা গেছে বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রে দাবি করা হয়েছে।  একই সময়ে একটি সাদা মাইক্রোবাসের চলাচলের ফুটেজও তদন্তে এসেছে।
হানিফ মিয়া, মোস্তফা জগলুল পাশা ওরফে পাপেল এবং আবুল কালাম আজাদ ওরফে শুটার লেলিন ওই মাইক্রোবাসে ঘটনাস্থলের আশপাশে ঘুরে হামলাকারীদের নির্দেশনা দিয়েছেন—এমন অভিযোগও তদন্তে রয়েছে।
এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য ও তদন্তের চূড়ান্ত ফলই নির্ধারণ করবে তাঁদের ভূমিকা কী ছিল। রাড্ডার ঘটনায় রাজনৈতিক অঙ্গনেও ব্যাপক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে।  বিএনপি, ছাত্রদল, স্বেচ্ছাসেবক দল ও শ্রমিক দলের বিভিন্ন পর্যায়ের বেশ কয়েকজন নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
শাহ আলী থানা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক খলিল চৌধুরী, সি-ব্লক ইউনিট বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার হোসেন, ৯৩ নম্বর ওয়ার্ড ছাত্রদলের সদস্যসচিব শান্ত রহমান, অটোরিকশা শ্রমিক দলের সভাপতি জাহাঙ্গীর হোসেন ও সদস্য হুজাইফাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়।
এ ছাড়া ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সদস্য হাফিজুর রহমান শুভ্র, দারুস সালাম থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক আক্তার হোসেন মামুন, সদস্যসচিব হাফিজুর রহমান, দারুস সালাম শ্রমিক দলের আহ্বায়ক গোলাম রসুল পারভেজ, শাহ আলী থানা শ্রমিক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক মনির হোসেন, ঢাকা মহানগর পশ্চিম ছাত্রদলের সহসভাপতি সারোয়ার আলম পিয়াস, সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম জিন্নাহ, দারুস সালাম থানা ছাত্রদলের আহ্বায়ক ইকবাল হোসেন দিপু এবং সদস্যসচিব ওমর নাঈমকেও বহিষ্কার করা হয়েছে।
পুলিশ বলছে, তদন্তে সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়ার পর বিভিন্ন পর্যায়ের এসব নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
তবে দলীয় বিজ্ঞপ্তিতে রাড্ডার ঘটনার কথা সরাসরি উল্লেখ না করে দলীয় শৃঙ্খলাবিরোধী ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা বলা হয়েছে।
ঢাকা মহানগর উত্তর যুবদলের সদস্যসচিব সাজ্জাদুল মিরাজের অভিযোগ, হামলায় জড়িত ব্যক্তিদের তিনি চেনেন এবং ঘটনা ঘটার পরপরই থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও উপকমিশনারকে বিষয়টি জানিয়েছিলেন। তাঁর দাবি, তাঁর দেওয়া তথ্য সঠিক নয় বলে তাঁকে জানানো হয়েছিল। তিনি আরও অভিযোগ করেন,পুলিশের উপস্থিতির মধ্যেই মালামাল সরিয়ে নেওয়া হচ্ছিল এবং এ বিষয়ে তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করেছিলেন। পুলিশি ভূমিকা নিয়েও তদন্তের কথা উঠে এসেছে; একটি প্রতিবেদনে ঘটনাস্থলে দায়িত্বে থাকা পুলিশের সদস্যদের কার্যক্রম খতিয়ে দেখার তথ্য প্রকাশিত হয়েছে।
ঘটনার পরদিন ২৫ সেপ্টেম্বর রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারের পক্ষ থেকে শাহ আলী থানায় মামলা করা হয়।
মামলায় ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সাবেক সদস্য মোহাম্মদ হানিফ মিয়াসহ আরও ২৫০ জনকে অজ্ঞাত আসামি করা হয়েছে।
হামলার সঙ্গে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের নাম সামনে আসার পর দলীয় পর্যায়েও ব্যবস্থা নেওয়া শুরু হয়।
এ ঘটনায় বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির নামও আলোচনায় আসে।
তিনি হামলা ও ভাঙচুরের সঙ্গে নিজের সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, তদন্তে তাঁর বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পরবর্তীতে ১ অক্টোবর ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি সংসদ সদস্য পদ থেকে পদত্যাগ করেন। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশের পর তিনি পদত্যাগ করেন।
রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলা, লুটপাট ও স্থাপনা ধ্বংসের ঘটনায় মানবাধিকার সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকেও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। মানবাধিকারকর্মীরা বলেছেন, একটি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে হামলা শুধু সম্পদ ধ্বংসের বিষয় নয়; এর ফলে সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার অধিকারও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
তাঁরা ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত, জড়িতদের শনাক্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা এবং ক্ষতিগ্রস্ত স্বাস্থ্যসেবা পুনরায় চালুর দাবি জানিয়েছেন।
আইন বিশ্লেষকদের মতে, কোনো স্থাপনা বা জমি নিয়ে বিরোধ থাকলেও তা নিষ্পত্তির জন্য আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী নিজের হাতে আইন তুলে নিয়ে জোরপূর্বক দখল, ভাঙচুর বা স্থাপনা ধ্বংস করতে পারে না। অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট, অবৈধ প্রবেশ ও সম্পদ নষ্ট করার ঘটনায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনে পৃথকভাবে দায় নির্ধারণের সুযোগ রয়েছে।
একই সঙ্গে কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলেই তাকে অপরাধী হিসেবে চূড়ান্তভাবে বিবেচনা না করে তদন্ত ও আদালতের প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দায় নির্ধারণের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন আইনজীবীরা।
রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার দীর্ঘদিন ধরে সুবিধাবঞ্চিত ও নিম্নআয়ের মানুষের স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে আসছিল।
হামলার পর স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যেও চিকিৎসাসেবা পাওয়া নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
স্থানীয়দের কেউ কেউ দ্রুত স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির কার্যক্রম পুনরায় চালু করার দাবি জানিয়েছেন।
তাঁদের বক্তব্য, এ ধরনের স্বাস্থ্যকেন্দ্রের সেবা বন্ধ হয়ে গেলে সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েন নিম্নআয়ের মানুষ, নারী ও শিশুরা।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকেই বলছেন, হামলার রাতে বিপুলসংখ্যক লোকজনের উপস্থিতি, ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার এবং স্থাপনা ভাঙার মতো ঘটনা এককভাবে ঘটার কথা নয়।
কারা হামলাকারীদের সংগঠিত করেছিল, কারা অস্ত্র ও সরঞ্জাম সরবরাহ করেছিল এবং কারা ঘটনাস্থলে তাদের নির্দেশনা দিয়েছিল—এসব বিষয় তদন্তের মাধ্যমে পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন তাঁরা।
ঢাকা মহানগর পুলিশের মিরপুর বিভাগের উপকমিশনার হাসান মোহাম্মাদ নাছের রিকাবদার জানিয়েছেন, হামলার নির্দেশদাতা ও সংশ্লিষ্টদের মধ্যে প্রায় ৩০ জনকে শনাক্ত করা হয়েছে এবং তাঁদের মধ্যে ১৬ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
তাঁর ভাষ্য, গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হামলায় জড়িত থাকার কথা স্বীকার করছেন না; তবে প্রযুক্তিগত তথ্যের মাধ্যমে তাঁদের সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়া গেছে।
বাকি ব্যক্তিদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে।
তদন্তে এখন হামলায় সরাসরি অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের পাশাপাশি পরিকল্পনা, সমন্বয়, অস্ত্র ও সরঞ্জাম সংগ্রহ, হামলাকারীদের নির্দেশনা এবং ঘটনার পর লুট করা মালামাল সরানোর সঙ্গে কারা জড়িত ছিলেন—এসব বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পুলিশের দাবি, তদন্তে যাদের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়া যাবে, তাদের সবাইকে আইনের আওতায় আনা হবে।
নিউজ ডেস্ক:

Leave a Reply