সারাদেশ

পাঁচলাইশে স্বর্ণ আত্মসাতের হোতাসহ ৬ জন আটক, ৯৯ ভরি স্বর্ণ উদ্ধার

চট্টগ্রাম নগরীর পাঁচলাইশে জুয়েলারি প্রতিষ্ঠানের মজুদ থেকে বিপুল পরিমাণ স্বর্ণের চুড়ি আত্মসাতের ঘটনায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। দোকানের মজুদে থাকা আসল স্বর্ণের চুড়ির পরিবর্তে ইমিটেশন চুড়ি রেখে কৌশলে পালিয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে দীর্ঘদিনের এক সেলসম্যানের বিরুদ্ধে। পরে পুলিশের ধারাবাহিক অভিযানে চট্টগ্রামের বিভিন্ন জুয়েলার্স ও স্বর্ণ বন্ধকী ব্যবসায়ীর কাছ থেকে আত্মসাৎকৃত ৫৫ পিস স্বর্ণের চুড়ি উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধার হওয়া স্বর্ণের মোট ওজন ৯৯ ভরি ৪ আনা ৫ রত্তি বা ১১৫৮.৩৩ গ্রাম। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত ৬ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

পুলিশ ও মামলার তথ্য অনুযায়ী, পাঁচলাইশ মডেল থানাধীন প্রবর্তক মোড় সংলগ্ন মিমি সুপার মার্কেটের দ্বিতীয় তলায় ‘নিউ কনক বাহার জুয়েলার্স’ নামের প্রতিষ্ঠানের মালিক জনব বিপ্লব বসাক (৫৩)। ওই প্রতিষ্ঠানে প্রায় ১২-১৩ বছর ধরে সেলসম্যান হিসেবে কাজ করতেন রোমেন দে (৩৬)। নিয়ম অনুযায়ী দোকানের কর্মচারীরা প্রতি সপ্তাহে স্বর্ণালংকারের মজুদ মিলিয়ে দেখতেন।
গত ১৪ আগস্ট ২০২৬ দুপুর আনুমানিক ১২টার দিকে স্টাফরা দোকানের স্বর্ণের মজুদ মিলাতে গিয়ে অসঙ্গতি দেখতে পান। বিষয়টি মোবাইল ফোনে দোকানের মালিককে জানানো হলে তিনি বাসা থেকে দ্রুত দোকানের উদ্দেশে রওনা হন। পুলিশ বলছে, মালিক আসার বিষয়টি বুঝতে পেরে সেলসম্যান রোমেন দে ওয়াশরুমে যাওয়ার কথা বলে কৌশলে দোকান থেকে পালিয়ে যান।
পরে মালিক ও অন্যান্য স্টাফ মিলে দোকানের মজুদ পরীক্ষা করে দেখতে পান, রোমেন দের দায়িত্বে থাকা সাতটি বক্সে রাখা ৫৩টি স্বর্ণের চুড়ি নেই। ওই চুড়িগুলোর পরিবর্তে বক্সে রাখা হয়েছে ইমিটেশন চুড়ি। মামলার তথ্য অনুযায়ী, নিখোঁজ ৫৩টি স্বর্ণের চুড়ির ওজন প্রায় ৯২৭.৫০০ গ্রাম বা ৭৯.৫১ ভরি এবং আনুমানিক মূল্য ১ কোটি ৮৮ লাখ ২৯ হাজার ৯০০ টাকা।
এ ঘটনায় দোকানের মালিক ১৫ আগস্ট পাঁচলাইশ মডেল থানায় মামলা করেন। মামলাটি তদন্তের দায়িত্ব পান এসআই (নিঃ) শওকত ইমাম। অফিসার ইনচার্জের নির্দেশনায় তদন্তকারী কর্মকর্তা সঙ্গীয় অফিসার ও ফোর্স নিয়ে গুপ্তচর তথ্য এবং তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় অভিযান শুরু করেন। এর ধারাবাহিকতায় ১৮ আগস্ট রাত আনুমানিক ২টার দিকে সীতাকুণ্ড থানাধীন ফৌজদারহাট মহাসড়ক এলাকা থেকে মামলার আসামি রোমেন দেকে গ্রেপ্তার করা হয়।
পরে আদালতের অনুমতি নিয়ে রোমেন দেকে পুলিশ হেফাজতে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে আত্মসাৎকৃত স্বর্ণের চুড়িগুলো বিভিন্ন জুয়েলার্স ও বন্ধকী ব্যবসায়ীর কাছে রাখার তথ্য পাওয়া যায়। জিজ্ঞাসাবাদে রোমেন জানান, ৫৩টি চুড়ির মধ্যে ৪৬টি চুড়ি বাকলিয়া থানাধীন মিয়াখান নগর রোডের ‘মর্ডাণ ইরানী জুয়ের্লাস’-এর মালিক শ্যামল সিংহ (৪৭)-এর কাছে বন্ধক রাখা হয়েছে।
রোমেনের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ১৯ আগস্ট রাতে বোয়ালখালী থানাধীন কানুনগোপাড়া এলাকা থেকে শ্যামল সিংহকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী বাকলিয়া থানাধীন মিয়াখান নগর রোডে তার মালিকানাধীন ‘মর্ডাণ ইরানী জুয়ের্লাস’ থেকে সাতটি স্বর্ণের চুড়ি উদ্ধার করা হয়। এসব চুড়ির মোট ওজন ১৪২.৪০ গ্রাম।


পরবর্তীতে শ্যামল সিংহকে জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, তার কাছে থাকা অবশিষ্ট ৩৯টি স্বর্ণের চুড়িও বিভিন্ন জুয়েলার্স ও বন্ধকী ব্যবসায়ীর কাছে রাখা হয়েছে। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ২০ আগস্ট কোতোয়ালী থানাধীন বিভিন্ন স্বর্ণ বন্ধকী প্রতিষ্ঠান থেকে একে একে স্বর্ণের চুড়ি উদ্ধার করা হয়।
পুলিশের তথ্যমতে, ‘মর্ডাণ রিনা জুয়ের্লাস’ থেকে তিনটি চুড়ি, ‘সাহা জুয়েলার্স’ থেকে ১৬টি চুড়ি, বন্ধকী ব্যবসায়ী লিটন মহাজনের কাছ থেকে একটি, সাগর কারিগরের কাছ থেকে পাঁচটি, পার্থ মহাজনের কাছ থেকে ১১টি এবং রুবেল মহাজনের কাছ থেকে তিনটি স্বর্ণের চুড়ি উদ্ধার করা হয়।
এদিকে রোমেন দের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বাকলিয়া থানাধীন ‘মর্ডাণ রিয়া জুয়ের্লাস’ থেকে তিনটি এবং ‘শাহ আমানত জুয়ের্লাস’ থেকে তিনটি স্বর্ণের চুড়ি উদ্ধার করা হয়। পরে চকবাজার থানাধীন ‘ফেন্সী জুয়ের্লাস’ থেকে দুটি এবং ‘তাজমহল জুয়ের্লাস’ থেকে একটি স্বর্ণের চুড়ি উদ্ধার করা হয়।
পুলিশের দাবি, বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে সর্বমোট ৫৫ পিস স্বর্ণের চুড়ি উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধার হওয়া এসব স্বর্ণের চুড়ির মোট ওজন ১১৫৮.৩৩ গ্রাম, অর্থাৎ ৯৯ ভরি ৪ আনা ৫ রত্তি।
আইন বিশ্লেষকদের মতে, কোনো প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মচারী বিশ্বাস ও দায়িত্বের সুযোগ নিয়ে প্রতিষ্ঠানের সম্পদ আত্মসাৎ করলে বিষয়টি গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। একই সঙ্গে আত্মসাৎকৃত সম্পদ জেনেশুনে গ্রহণ, গোপন রাখা বা বন্ধক রাখার সঙ্গে কেউ জড়িত থাকলে তাদের ভূমিকা ও জ্ঞাতসারে সম্পৃক্ততার বিষয়টি তদন্তে গুরুত্ব পাবে। তবে কার বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ প্রমাণিত হবে, তা তদন্তের তথ্য-প্রমাণ ও শেষ পর্যন্ত আদালতের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে।
সমাজ বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিনের কর্মচারীর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের বিপুল সম্পদ আত্মসাতের অভিযোগ কর্মক্ষেত্রে পারস্পরিক আস্থার সংকট তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে স্বর্ণের মতো উচ্চমূল্যের পণ্যের ক্ষেত্রে মালিকপক্ষের অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ, নিয়মিত হিসাব যাচাই এবং প্রতিটি লেনদেনের স্বচ্ছ নথিপত্র রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে স্বর্ণ বন্ধকী ব্যবসায়ীদেরও বন্ধক নেওয়ার সময় পণ্যের মালিকানা, পরিচয় ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যাচাই করা জরুরি।
পাঁচলাইশ মডেল থানা পুলিশের এ অভিযানে আত্মসাৎকৃত স্বর্ণের বড় একটি অংশ উদ্ধার হওয়ায় মামলার তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছে। তবে ঘটনার সঙ্গে আরও কেউ জড়িত কি না, আত্মসাৎকৃত স্বর্ণের পুরো লেনদেনে কারা যুক্ত ছিল এবং উদ্ধার হওয়া স্বর্ণগুলো কীভাবে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে গেছে—এসব বিষয় খতিয়ে দেখছে পুলিশ। মামলায় গ্রেপ্তার ৬ আসামির বিরুদ্ধে আইনানুগ প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।

নিউজ ডেস্ক:

Leave a Reply